Home সাক্ষাৎকার "সব অন্ধকারের শেষে মানুষের জয় হবেই" আমাদের আজকের আড্ডায় প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী...

“সব অন্ধকারের শেষে মানুষের জয় হবেই” আমাদের আজকের আড্ডায় প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী প্রসেনজিৎ মল্লিক

জিৎ সায়ন্তিকার “আওয়ারা” হোক কিংবা জিৎ শ্রাবন্তী অভিনীত “দিওয়ানা”, আরও বাংলার বহু হিট ছবিতে যার কথা ও গানে আমরা নেচে উঠেছি বহুবার, কখনও বা যার গানে প্রেমে ভেসেছি। আমাদের আজকের আড্ডায় বাংলা ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রির সেই প্রখ্যাত গায়ক ও লিরিসিস্ট প্রসেনজিৎ মল্লিকের মুখোমুখি আমি রাজেশ।

1)প্রশ্ন: আজ সবার কাছে খুব পরিচিত নাম “প্রসেনজিৎ মল্লিক”, এত গুলো বাংলা হিট ফিল্মে প্লেব্যাক। তো সাধারণ জীবন থেকে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, তোমার এই জার্নির গল্পটা যদি তুমি আমাদের বলো?

প্রসেনজিৎ দা: আমি মনে করি জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ কখনই সহজ হয় না। তার পিছনে খারাপ ভালো অনেক স্মৃতি থাকে, আমারও আছে। আমি সাধারন পরিবারের ছেলে। আমার প্রথম গানের হাতেখড়ি মায়ের হাত ধরেই। এরপর যখন আমি স্কুলে পড়তাম তখন টিফিন টাইমে আমাদের আড্ডার বিষয় ছিল গান। আমার দুটো বন্ধু ছিল তার মধ্যে একজন খুব ভালো বেঞ্চ বাজাতো, তো সে বেঞ্চ বাজাতো আর আমি গান গাইতাম, বাকি ক্লাসের সবাই আমাদের ঘিরে গান শুনতো। আমার আরো এক বন্ধু ছিল সে গিটার শিখতো আমি অনেক সময় তার বাড়িতে যেতাম সে গিটার বাজাতো আমি গান করতাম। আর সেই সময় বিভিন্ন বাংলা ব্যান্ডের গান আমি টিভি ও রেডিও তে খুব শুনতাম এবং সেই গানগুলো শুনে আমারও মনে হতো আমিও তো এরকম গান তৈরী করতে পারি। তো তখন থেকেই আমি গান লিখতে শুরু করি। এরপর থেকে আমরা ছোটো বড়ো বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্রাম করতে থাকি। প্রোগ্রাম করতে করতে আমার পরিচয় হয় দুজন মিউজিক ডিরেক্টরের সাথে, তারাও সে সময় ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন ছিলেন। তারা আমায় বলেন যে আমার গান তাদের খুব ভালো লেগেছে, আমি যেনো স্ক্রাচ গাওয়ার জন্য স্টুডিওতে যাই। সেই সময় স্ক্রাচ গাওয়াটা কি ঠিক বুঝতাম না। আসতে আসতে বুঝতে থাকি। প্রথম দিকে সামনে থেকে আমি অনেক বড়ো শিল্পীদের রেকর্ডিং দেখার সুযোগ পাই এবং অনেক বড়ো শিল্পীর গানের ব্যাক ভোকালে গাওয়ারও সুযোগ পাই। সেখান থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এরপর প্রথম আমি প্লেব্যাক করি জয় ও সায়ন্তিকা অভিনীত “মনে পরে আজও সেই দিন” সিনেমায়। এই সিনেমায় আমি তিনটি গান গাই। তারপর থেকে আওয়াড়া, দিওয়ানা ও আরো বেশ কিছু সিনেমায় আমি নিজে গান লিখেছি এবং গেয়েছিও।

2)প্রশ্ন: প্রত্যেকটা সফল মানুষের পেছনেই একটা কঠিন স্ট্রাগেল এর গল্প লুকিয়ে থাকে। আমরা তোমার কাছ থেকে তোমার স্ট্রাগেল এর গল্পটা শুনতে চাই।

প্রসেনজিৎ দা: এটা কখনোই গল্প নয় এটা কঠিন একটা বাস্তব। আমি আগেই বলেছি যে আমার দুজন মিউজিক ডিরেক্টরের সাথে আলাপ হয়েছিলো এবং তারা আমায় স্ক্রাচ গাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তো যখন আমি স্ক্রাচ গাইতাম আর পরে আমার গলা সরিয়ে অন্য গায়কের গলায় সেই গানটি গাওয়ানো হতো তখন আমার খুব মনে হতো যে হয়তো আমি অত সুন্দর ভাবে গানটা গাইতে পারি নি, আমার বোধহয় কোথাও কমতি রয়ে গেছিলো। নিজের ভুল ত্রুটি গুলোকে খুজে বার করতাম সেগুলোকে ওভারকাম করে নেক্সট বার আরো ভালো করে গাওয়ার চেষ্টা করতাম।
অনেক সময় এমনও হয়েছে যে আমি বাড়ি থেকে সকাল ১০ টায় স্টুডিও তে গেছি রেকর্ডিং এ। আমার লেখা লিরিক্স এর কোনো জায়গা হয়ত ঠিকঠাক ম্যাচ করছে না বা গানের কোনো একটা পার্ট গাইছি সেই জায়গাটা ডিরেক্টরের মনমতো হচ্ছেনা তখন সারারাত জেগে লিরিক্স change করে গেছি বা গানের টেক দিয়ে গেছি। যখন আর শরীর চলতো না, একটা ১০ মিনিট এর ন্যাপ নিয়ে আবার লিখতে বসতে হয়েছে বা গান গাইতে হয়েছে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে পরের দিন সকাল হয়ে গেছে।
এই ভাবে স্ট্রাগল করেই সেই আমি থেকে এই আমি তে পরিণত হয়েছি।

prasenjit-mallick-tollywood-play-back-singer

3)প্রশ্ন: তোমার Hobbies কি? মানে গান বাদে তুমি আর কি করতে ভালোবাসো?

প্রসেনজিৎ দা: Hobbies বলতে আমার নিজের গাড়ি চালিয়ে ঘুরতে যেতে খুব ভালোলাগে, আর সেটা যদি বৃষ্টির দিন হয় তাহলে তো আরো ভালো। আমি মাঝে মধ্যেই বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। সাথে রাস্তার ধারে কোনো চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা খাওয়া এর অনুভূতিটাই আলাদা আমার কাছে। তো এটাই আমার Hobby বলতে পারো।

4)প্রশ্ন: প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে একজন আদর্শ থাকে। তোমার জীবনে তুমি কাকে আদর্শ হিসেবে মনে করো?

প্রসেনজিৎ দা: আমি ছোটবেলা থেকে সোনু নিগমের অন্ধভক্ত। সোনু নিগম একজন versatile singer.. তিনি নাচের গান, রোমান্টিক গান বা দুঃখের গান, সব রকমের গান তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গান এবং তা মানুষের মনকে ছুঁয়ে যায়। তো আমিও চাইনি কখনো মানুষ আমাকে এই ভাবে চিনুক যে প্রসেনজিৎ মল্লিক শুধু নাচের গান গায় বা প্রেমের গান গায়। আমিও সব সময় চেয়েছি মানুষ আমাকে একজন versatile singer হিসেবেই চিনুক।

পাশাপাশি জীবনে চলার পথে আমি সৌরভ গাঙ্গুলিকে খুব follow করি। সব মানুষের জীবনেই চড়াই উৎরাই এসেছে এবং আমার জীবনেও এসেছে। কিন্তু এই মানুষটা কঠিন পরিস্তিতির মধ্যে যে ভাবে সংঘর্ষ করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বার বার সেই জিনিসটা আমাকে খুব inspire করে।
আর যার কথা না বললেই নয় তিনি হলেন রুপম ইসলাম। এই মানুষটাও প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে inspire করে, এবং এই মানুষগুলোকেই আমি আমার জীবনে চলার পথে আদর্শ বলে মনে করি।

5)প্রশ্ন: মানুষের সুদিনে বা দুর্দিনে, দুঃখে বা সুখে সবসময়ের সঙ্গী হলো আপনার মতো শিল্পীদের গাওয়া গান। মানুষ হয়ত অতদিন বেঁচে থাকেনা যতদিন গান বেঁচে থাকে। এই প্রাপ্তিটা আপনার কাছে কতটা মূল্যবান?

প্রসেনজিৎ দা: আমার কাছে এই প্রাপ্তিটা কোটি টাকার চেয়েও অনেক বেশী মূল্যবান। বিশেষ করে যখন ধরো আমি রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছি আর হঠাৎ দেখি পুজোর প্যান্ডেলে, বাড়িতে বা কোনো দোকানে আমার গান লোকে শুনছে বা গুনগুন করে গাইছে তখন এতো ভালোলাগে যে মনে হয় এর থেকে বড়ো প্রাপ্তি হয় তো আর কিছু হতে পারে না। আবার অনেক সময় এমনও হয়েছে অনেক দিন হয়ে গেছে আমার কোনো গান আসেনি বা আমি লাইভে আসিনি তখন অনেক মানুষ আমায় ফেসবুকে মেসেজ করে বলে “আমার গান তাদের শুনতে ভালোলাগে”, “আমার গান শুনলে তাদের মন ভালো থাকে” এই কথা গুলো শুনলে মনে হয় এর থেকে বড়ো পাওনা হয়তো জীবনে আর কিছু হতে পারে না। সেই অনুভূতিটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

6)প্রশ্ন:সবারই এগিয়ে চলার পিছনে কারোর একটা অবদান থাকেই। তোমার জীবনে এগিয়ে চলার পথে কার অবদান সবথেকে বেশি?

প্রসেনজিৎ দা: এই ভাবে নির্দিষ্ট কোনো মানুষের নাম কখনোই বলা যায় না। আর আমি মনে করি জীবনে এগিয়ে চলার পথে কোনো particular একজন মানুষের অবদান থাকে না। যাই হোক, প্রথমেই বলবো আমার মায়ের কথা কারণ আমি আগেই বলেছি মায়ের থেকেই আমি গান শেখার শুরু। এছাড়া আমার প্রথম গানের গুরু যিনি ছিলেন বা যার কাছে আমি এখনো গান শিখি তিনি। এছাড়াও জীবনে চলার পথে এমন অনেক মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে এবং যাদের সাথে পরিচয় হবার ফলে আমি এতদূর আসতে পেরেছি, জীবনে সাফল্য অর্জন করেছি তাদের অবদানও রয়েছে। পাশাপাশি যাদের জন্য আমি স্টেজে আমার গানগুলো এত সুন্দভাবে মানুষের সামনে মেলে ধরতে পারি সেই মিউজিসিয়ান দের অবদানও অনস্বীকার্য।

7)প্রশ্ন: রিসেন্টলি তোমার একটা গান রিলিজ করছে, যদি তার ব্যাপারে কিছু বলো

প্রসেনজিৎ দা: হ্যাঁ কয়েক দিন আগেই আমার নিজের কথা ও সুরে নতুন গানের মিউজিক ভিডিও রিলিজ হয়েছে “মানুষের জয় মানুষের গান“। কোনো অন্ধকারই চিরস্থায়ী হয় না, এই অন্ধকারও একদিন ঠিক কেটে যাবে। এই পরিস্তিতিকে কাটিয়ে আবার ও মানুষের জয় হবে এই ভাবনাকে সাথে নিয়েই এই বিপদের দিনে মানুষের মনোবল বাড়াতেই আমাদের এই প্রয়াস।

8)প্রশ্ন: তোমার শ্রোতারা যারা তোমায় এত ভালোবাসা দিয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে তুমি কি বলতে চাও?

প্রসেনজিৎ দা: তাদের ধন্যবাদ জানানোর মতো ভাষা আমার কাছে নেই। তারা না থাকলে আমাদের মত মিউজিক নিয়ে যারা কাজ করে তাদের অস্তিত্বটা হয়তো থাকতো না। তারা আছে বলেই আমরা আছি। তাদের একটাই কথা বলবো এভাবেই যেনো আমাদের পাশে থাকেন তারা।

সবশেষে এবিও পত্রিকা পক্ষ থেকে প্রসেনজিৎ দাকে কে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। তার মহামূল্যবান সময় থেকে আমাদের কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য।
আমাদের তরফ থেকে তোমার আগামী দিনের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল। তুমি ও তোমার পরিবারের সকলে ভালো থেকো, সুস্থ থেকো, এবং সুরক্ষিত থেকো এই কামনাই করি।

আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন: https://facebook.com/abopatrika/

এই টেলিফোনিক ইন্টারভিউ টির লিখিত রূপ দিতে সাহায্য করেছে Susmita Sen

- Advertisment -

জনপ্রিয়

শ্যুটিং শুরু হলো Milky Way Films দ্বারা প্রযোজিত ছবি “শব চরিত্র”-এর…

দেবাশিস সেন শর্মার পরিচালনায় এবং Milky Way Films এর প্রযোজনায় আসতে চলেছে নতুন ছবি "শব চরিত্র". ইতি মধ্যেই ছবির শ্যুটিং শুরু হয়ে গেছে. ছবিটি...

প্রকাশিত হলো লেখক রয় ফিনিক্সের প্রথম উপন্যাস অ্যালফাবেটিকা এক রূপক কাহিনী…

নতুন লেখক রয় ফিনিক্সের প্রথম উপন্যাস অ্যালফাবেটিকা এক রূপক কাহিনী। এই কাহিনী সমাজের যে ফাঁক ফোকর দিয়ে সংখ্যাগুরুর আধিপত্য মাথা তোলে, তার গল্প রয়...

শীঘ্রই মুক্তি পেতে চলেছে রৌনক ধরের পরিচালনায় ও উৎসরিক দাসগুপ্তর প্রযোজনার নতুন ছবি ‘সত্যায়ন’

সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে এআর এসএস এন্টারটেইনমেন্ট ও বক্স অফিস এর পরবর্তী ছবি 'সত্যায়ন' এর প্রমো এবং পোস্টার। রৌনক ধর এর পরিচালনায় ও উৎসরিক দাশগুপ্তর...

তৃষা’র কন্ঠে আসতে চলেছে দিব্য প্রীতম জুটির নতুন গান ‘একলা সারাদিন’…

প্রীতম দেবের সুরে ও গীতিকার দিব্যদ্যুতির লেখা গান "একলা সারাদিন" গাইলেন সঙ্গীতশিল্পী তৃষা চ্যাটার্জী। ২রা ডিসেম্বর সঙ্গীত পরিচালক প্রীতম দেবের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থেকে...