Home অজানা তথ্য ইংল্যান্ডের মুচি থেকে শ্রীরামপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। জেনে নিন উইলিয়াম কেরির ব্যাপারে

ইংল্যান্ডের মুচি থেকে শ্রীরামপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। জেনে নিন উইলিয়াম কেরির ব্যাপারে

একটি দরিদ্র তাঁতী পরিবারে 1761 খ্রিষ্টাব্দের 17 ই আগষ্ট উত্তর ইংল্যাণ্ডের নর্থহ্যাম্পটনডায়ার-এর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম এডমুন্ড কেরি ও মায়ের নাম এলিজাবেথ।

1777 খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম হ্যাকেল্টন-এ ক্লার্ক নিকোলাস নামক এক মুচির অধীনে  কাজ জুতো তৈরির কাজ শেখা শুরু করেন। এখানে থাকাকালীন তিনি চার্চ অফ ইংল্যান্ড ত্যাগ করে হ্যাকেল্টনের নিকটবর্তী Congregational  চার্চের সাথে যুক্ত হন।

1779 খ্রিষ্টাব্দে ক্লার্ক নিকোলাস-এর মৃত্যুর পর তিনি স্থানীয় জুতো প্রস্তুতকারক থমাস ওল্ড-এর অধীনে চাকরি নেন। 1781 থমাস ওল্ড-এর শালী ডরোথি প্যাকেট-কে তিনি বিবাহ করেন। ডরোথি লেখাপড়া জানতেন না, তাই বিবাহের নিজের স্বাক্ষরের স্থানে ক্রস চিহ্ন দিয়েছিলেন। এঁদের মোট ৫টি পুত্র ও 2 টি কন্যা সন্তান জন্মেছিলে। এঁদের দুটি কন্যাই শৈশবে রোগগ্রস্থ হয়ে মারা যায়। আর পিটার নামক পুত্রটি মারা যায় 5 বছর বয়সে। এর কিছুদিনের ভিতরে থমাস ওল্ড পরলোক গমন করলে, উইলিয়াম কেরি তাঁর ব্যবসার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। থমাস ওল্ড হিব্রুভাষা-সহ ইউরোপের অনেকগুলো ভাষা জানতেন। জুতা তৈরি ফাঁকে ফাঁকে তিনি কেরিকে শিখিয়েছিলেন হিব্রু, ইতালিয়ান, ডাচ ও ফরাসি ভাষা।

এইভাবে স্বশিক্ষিত হয়ে উঠার কারণে স্থানীয় মিশনারীদের সাথে পরিচয় গড়ে উঠে। মাঝে মাঝে তাঁকে স্থানীয় গির্জায় ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানোও হতো। 1785 খ্রিষ্টাব্দে মৌল্টন স্কুলে শিক্ষতার চাকরি পান। এই চাকরির পাশাপাশি তিনি প্যাস্টর হিসেবে গির্জায় ভাষণও দিতেন। এই সময় তিনি গির্জা ও স্কুলের সূত্রে নানা ধরনের বই পড়ার সুযোগ পান।

1789 খ্রিষ্টাব্দে তিনি Harvey Lane Baptist Church in Leicester-এ পূর্ণকালীন প্যাস্টর পদ পান।  এই সময় তিনি জুতো তৈরির কাজ ছেড়ে দিয়ে পূর্ণদমে মিশনারির কাজ শুরু করেন। 1792 খ্রিষ্টাব্দে এই বৎসরে প্রকাশিত হয়− পাঁচখণ্ডের গ্রন্থ , An Enquiry into the Obligations of Christians to use Means for the Conversion of the Heathens। এই বৎসরের অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়  the Particular Baptist Society for the Propagation of the Gospel Amongst the Heathen। এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভারতে ধর্ম প্রচারের জন্য তাঁকে নির্বাচন করা হয়। 1793 খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে জাহাজযোগে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন, তাঁর ফেলিক্স এবং থমাস ও তাঁর স্ত্রী-কন্যা। তাঁর নিজের স্ত্রী ডরোথি তখন সন্তানসম্ভবা থাকায়, তিনি তাঁর বোনের তত্ত্বাবধানে স্ত্রীকে রেখে যাত্রা করেন।

1793 খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তিনি কলকাতায় আসেন। কলকাতায় এসে স্থানীয় লোকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের জন্য, রামরাম বসুর কাছে বাংলা শিখতে আরম্ভ করেন। এই সময় দুটি নীলকুঠির মালিক ছিলেন থমাসের এক বন্ধু। এই কুঠির ম্যানেজার হিসেবে তিনি চাকরি নেন এবং পুত্র ও পুত্রবধূদের নিয়ে মেদেনীপুরে চলে আসেন। পরবর্তী ছয় বৎসর এই কুঠিতে কাজ করেন এবং বাংলা ভাষায় বাইবেলের নতুন নিয়মের অনুবাদ করেন। 1796 খ্রিষ্টাব্দে তাঁর 5 বৎসরের পুত্র পিটার এই সময় আমাশয় রোগে তাঁর পুত্র পিটার মারা যান। এই কারণে তাঁর স্ত্রীর স্নায়ুবৈকল্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত এই রোগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল 1807 খ্রিষ্টাব্দে।

ইতিমধ্যে মূল মিশনারি কমিটি ভারতে আরও মিশানারি পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই সূত্রে জন ফাউন্টেইন নামক একজন নতুন মিশানরি হিসেবে আসেন এবং মেদেনীপুরে স্কুল চালু করেন। এরপর 1799 খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে আসেন উইলিয়াম ওয়ার্ড, ডেভিড ব্রুনস্‌ডন, জশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়াম গ্র্যান্ড। এই সময় ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি খ্রিষ্টধর্ম প্রচারে বাধা দিত। তাই  মার্শম্যান এবং ওয়ার্ড কোম্পানিকে ফাঁকি দিয়ে একটি মার্কিন জাহাজে এসেছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁদের আসল উদ্দেশ্যের খবর পেয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করতে যায়। সেজন্যে তাঁরা কলকাতার অদূরে ডেনিশ মিশন শ্রীরামপুরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

1800 খ্রিষ্টাব্দের 10 ই জানুয়ারি কেরি এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। এঁদের প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুরে একটি মিশন গড়ে উঠে। ধর্মপ্রচার ও শিক্ষা প্রসারের তাঁর একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। এই প্রেস থেকে কেরির অনূদিত বাইবেলের ছাপা শুরু হয়। এই বছরেই ফাউন্টেইন মারা যান এবং তাঁরা প্রথম কৃষ্ণ পালকে খ্রিষ্টান বানাতে সক্ষম হন।

1801 খ্রিষ্টাব্দে ডেভিড ব্রুনস্‌ডন এবং থমাস মৃত্যুবরণ করেন। এই বছরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর-জেনারেল ওয়েলেসলি ইংল্যান্ড থেকে আগত কোম্পানির তরুণ সিভিলিয়ানদের দেশীয় ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃত, ভূগোল, বিজ্ঞান ইত্যাদি শেখানোর উদ্দেশ্যে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ স্থাপন করেন। কিন্তু তখন কলকাতায় বাংলা ভাষার একমাত্র সাহেব পণ্ডিত হেনরি পিটস ফরস্টার তাঁকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করতেন বলে বাংলা বিভাগ খুলতে পারেন নি। কেরিকে বাংলা বিভাগের উপযুক্ত শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করে 1801 খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে বাংলা বিভাগ চালু হয়। সেই সাথে উইলিয়াম কেরির অধীনে কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত এবং মনীষীও নিযুক্ত হন। সেই সময়কার বাংলার পণ্ডিতদের নিয়ে কেরি শ্রেণিকক্ষে ব্যবহার করার মতো কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেন।
উইলিয়াম বাংলা ভাষায় নিপুন হওয়ায় তিনি রামরাম বসু এবং মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রথম দু বছরে তিনটি গ্রন্থ এবং কেরি একটি বাংলা ব্যাকরণ ও আদর্শ সংলাপের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
1803 খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম কেরি নিজের মত করে একটি নতুন মিশানারি স্থাপন করেন।
1805 খ্রিষ্টাব্দে তাঁর লেখা মারাঠী ভাষার ব্যাকরণ (Marathi grammar) প্রকাশিত হয়।
1807 খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রথম স্ত্রী পরলোক গমন করেন। এই বৎসরে উইলিয়াম বেঙ্গাল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন।
1808 খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম কেরি ড্যানিশ মেয়ে Charlotte Rhumohr-কে বিবাহ করেন। এই বৎসরে তাঁর সংস্কৃত ভাষায় অনূদিত বাইবেলের নতুন নিয়ম প্রকাশিত হয়।
1809 খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ বাইবেলের অনুবাদ সম্পন্ন হয়।
1811 খ্রিষ্টাব্দে মারাঠি ভাষায় বাইবেল এর নতুন নিয়ম প্রকাশিত হয়।
1815 খ্রিষ্টাব্দে পাঞ্জাবি ভাষায় বাইবেল এর নতুন নিয়ম প্রকাশিত হয়।
1818 খ্রিষ্টাব্দে  সংস্কৃত ভাষায় বাইবেল এর পুরাতন নিয়ম অনূদিত হয়।
1820 খ্রিষ্টাব্দের 4 সেপ্টেম্বর তিনি এগ্রিকলাচার ও হর্টিকালচার সোসাইটি স্থাপন করেন।
1821 খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুরে তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলকে তিনি কলেজে রুপান্তরিত করেন। এই বছরে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন।
1825 খ্রিষ্টাব্দে তিনিই প্রথম একটি বাংলা-ইংরেজি অভিধান প্রণয়ন করেন।
1834 খ্রিষ্টাব্দের 9 ই জুন তিনি পরলোক গমন করেন।

- Advertisment -

জনপ্রিয়

মায়ের মৃত্যুদিনে পথ পশুদের কল্যাণার্থে পারমিতা মুন্সী ভট্টাচার্য এর পরিচালনায় হয়ে গেলো ‘বর্ষ বরণে বিবিয়ানা’

পথপশুদের কল্যাণার্থে শিবানী মুন্সী প্রোডাকশনের 'বর্ষবরণে বিবিয়ানা' শীর্ষক বাংলা নববর্ষের ক্যালেন্ডার প্রকাশ হয়ে গেল। এই ক্যালেন্ডার থেকে সংগৃহীত অর্থ খরচ করা হবে পথ পশুদের...

কি করলে আপনাকে বা আপনার পরিবারকে ছুঁতে পারবেনা করোনা

বর্তমানের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পাওয়াটাই এখন সকল মানুষের একমাত্র লক্ষ্য. কিন্তু কিভাবে পাবো এই ভয়ানক কোবিড ১৯ এর হাত থেকে মুক্তি? কোবিড ১৯ ভাইরাস...

অতিমারির মধ্যেও প্রকৃতির আরো কাছে ফিরে যাচ্ছেন জয়া আহসান..

করোনা নামক ভয়ঙ্কর ভাইরাস বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। কিন্তু শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে তার কণ্ঠে বিষন্নতা রয়েছে। চারিদিকে...

চারিদিকে অক্সিজেনের হাহাকার, এই পরিস্থিতিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন টলি তারকারা…

গোটা বিশ্ব আজ করোনা মহামারীর কবলে। Covid এর দ্বিতীয় ঢেউ তে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ সাথে মৃত্যু। করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে এই প্রথম দৈনিক সংক্রমণ বেড়ে...