Home সাক্ষাৎকার "লোকসঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র লক্ষ্য" -পৌষালি | exclusive interview

“লোকসঙ্গীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়াই একমাত্র লক্ষ্য” -পৌষালি | exclusive interview

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম কংক্রিটের জঙ্গলে, মনের অনুভূতি গুলোও আজ এসে দাঁড়িয়েছে ছোট্ট কিছু ইমোজি আর রিয়াক্টে। বদলেছে অনেক বাঙালী, বদলেছে বাঙালিয়ানা। তবুও আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা ভাষা হারায়নি তার মাধুর্য। আমাদের বাংলার নিজের গান, মাটির গান, গ্রাম বাংলার গান, লোকগীতি বা পল্লীগীতির ধারাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে যিনি, শুধু তাই নয় পৌঁছে দিয়েছে বিদেশের দরবারে। আজকের আড্ডায় সেই স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী পৌষালি ব্যানার্জীর মুখোমুখি আমি রাজেশ

প্রশ্ন:আপনার লোকগীতির প্রতি ভালোবাসার শুরু কবে থেকে এবং কি ভাবে?

পৌষালি দি: আমার লোকগীতির প্রতি ভালোবাসার শুরু বলতে পারো যখন আমি শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করতে গেছিলাম এবং ওখানে থাকা শুরু করেছিলাম তখন থেকেই। এই ভালোবাসার কারণ কিছুটা হলেও শান্তিনিকেতনের চারিপাশের পরিবেশ। আমি সেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতাম সেখানে বাউলদের গান শুনতাম, সেই গানের মধ্যে একটা আলাদাই ভালোবাসা খুজেঁ পেয়েছিলাম। শান্তিনিকেতনের কথা বলতে গেলে তার মধ্যে আমি শুধু রবীন্দ্র সঙ্গীত নয়, সেই মাটিতে লোক গানের উপস্থিতিও আমি ততটাই অনুভব করেছি। সেই থেকেই লোকগীতির প্রতি আমার ভালোবাসার শুরু।

প্রশ্ন: বহু রকমের গানের মধ্যে আপনার লোকগীতিকেই বেছে নেবার কারণ কি?

পৌষালি দি: প্রথমত লোকগীতি মাটির গান, পল্লিসমাজের গান। বাংলার এই সৃষ্টি, সেটা যাতে কোথাও হারিয়ে না যায়। রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল গীতি, ও অন্যান্য বাংলা গান যেমন বিশ্ব মানের দরজায় ঠাঁই পেয়েছে, এবং বহুল চর্চিত সেই জায়গা থেকে দেখতে গেলে লোকগানের চর্চা বা বিস্তার খুবই কম। আর আমার জীবনের এক বড়ো পাওয়া হলো কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের সান্নিধ্য। ওনাকে দেখেই আমার লোকগান গাওয়া শুরু। তিনি একটা কথা খুব বলতেন “কোনো সৃষ্টিকে যদি প্রজন্ম বহন করে নিয়ে যেতে না পারে তাহলে সেই সৃষ্টি সেখানেই শেষ হয়ে যাবে”। যেটা আমি কোনদিনই চাইনি আর চাইনা। আমি লোকগান কে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে চাই। যে মানুষ জানুক লোকগীতি বা লোকগান কি। সেই কারণেই আমার লোকগীতি কে বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন: আপনি শান্তিনিকেতনের মত ছোট্ট একটি জায়গা থেকে আজ যে জায়গায় পৌঁছেছেন, সেই পথ চলা নিশ্চই সহজ ছিলো না। সেই ব্যাপারে যদি কিছু বলেন-

পৌষালি দি: অনেক অপমান, অনেক লাঞ্ছনা শুনতে হয়েছে আমায়। ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অনেক মানুষের কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম যে আমাকে গান গাওয়ার বা রেকর্ড করার একটা সুযোগ দেওয়ার জন্য। আসলে আমি ছোট্ট এক জায়গা শান্তিনিকেতন থেকে belong করি, আমার পরিচিতি কম ছিলো, পেছনে কারো সাপোর্ট ছিলোনা তাই সকলে খুব সহজেই আমায় ফিরিয়ে দিত। তখন একটু মন ভেঙে যেত ঠিকই, কিন্তু আমি খুব জিদ্দি, হার মানতে শিখিনি কখনও। ২০১৬ সালে আমি সারেগামাপা এর আসানসোলে অডিশনে যাই, সেখানে প্রায় একটানা ৭-৮ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অডিশন দিই। একের পর এক ধাপ পেরিয়ে অবশেষে সিলেক্ট হই। এই কথাটা আমি গর্ব করে বলতে পারি যে আমি যেটুকু করেছি বা আজ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তা পুরো টাই নিজের চেষ্টায়, কারোর কোন সাপোর্ট ছাড়াই। এই লোকসঙ্গীত নিয়ে চলার পথে অনেক বড় বড় মানুষের থেকেও এই কথাটা শুনতে হয়েছে যে “লোক সঙ্গীত? কে শুনবে তোর লোক সঙ্গীত? ওই তো এক দুটো গান ‘তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো’ ‘রূপ সাগরে মনের মানুষ’ এর বাইরে লোক সঙ্গীত কেউ শোনে?”

খুব খারাপ লাগতো কথা গুলো তখন। কিছু উত্তর দিতে পারতাম না। আর আজ আমেরিকা থেকে মেদিনীপুর সব জায়গায়ই আমার গান মানুষ শোনে। আজ তাদের কথা গুলো মনে পরলে নিজেরই হাসি পায়।
তো এই ভাবেই এগিয়ে চলেছি, স্ট্রাগেল করে চলেছি। লোকগান কে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে আমায়।

প্রশ্ন: আপনার এই চলার পথের অনুপ্রেরণা আপনি সবচেয়ে বেশি কার বা কাদের কাছ থেকে পেয়েছেন?

পৌষালি দি: প্রথমে যাদের কথা না বললেই নয় তারা হলেন আমার বাবা, মা। আমার চলার পথের প্রথম অনুপ্রেরণা তারাই। কারণ আমি জীবনে অনেক কঠিন পরিস্তিতির মধ্যে দিয়ে গেছি। আর এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে মুখে হাসি রেখে কি ভাবে এগিয়ে যেতে হয় সেটা আমি আমার বাবা, মাকে দেখেই শিখেছি। এছাড়া আমার গানের গুরু, যার ভূমিকা আমার জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকে আমি যে জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি তারা না থাকলে হয়তো পারতাম না। আর যার কথা না বললেই নয় তিনি হলেন কালিকা দা (কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য), যে মানুষটার দেখে আমি অনেক কিছু শিখেছি, তো আমার চলার পথের অনুপ্রেরণা এনারাই।

প্রশ্ন: লোকসঙ্গীত নিয়ে এগিয়ে চলার পেছনে আপনার উদ্দেশ্যটি ঠিক কি?

পৌষালি দি: বাংলা আমাদের মাতৃভাষা মানে যে ভাষায় আমরা প্রথম মা’কে “মা” বলে ডাকি। এই বাংলার বুকে বাংলার মাটিতে বহু গানের সৃষ্টি যেমন ভাদু, তুসু, ঝুমুর, চটকা, হাওয়াইয়া, ছাদ পেটানো গান, গোয়াল পারি গান, জারি গান, সারি গান, চা বাগানের গান এই সব নিয়েই বাংলার লোকগান। এছারাও বাউল সঙ্গীত ও কীর্তনের সৃষ্টিও এই বাংলায়। বাংলায় সৃষ্টি হওয়া এই গান গুলির মধ্যে যে প্রাণের টান বা আবেগ বা ভাব লুকিয়ে আছে তা আর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে থেকে সেই সকল গান শোনার প্রচলন কমে যাচ্ছে। বর্তমানে লোকগানের মধ্যে বেশ কিছু গান এগিয়ে চলেছে বিলুপ্তির দিকে। যা আমি কখনই মেনে নিতে পারিনা। আগেই বলেছি যে কালিকা দা একটা কথা খুব বলতেন “কোনো সৃষ্টিকে যদি প্রজণ্ম বহন করে নিয়ে যেতে না পারে, তাহলে সেই সৃষ্টি সেখানেই শেষ হয়ে যাবে”। আমি কলিকা দা কে promise ও করেছিলাম যে লোকগান ছেড়ে কখনও আমি যাবো না। লোকগানের সেই ধারা কেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সেই গানের ভিতরে যে মাটির আবেগ, ভালোবাসা তা মানুষের চোখে ফুটিয়ে তোলাই আমার উদ্দেশ্য।

প্রশ্ন:আজকে আপনি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন তার পেছনে কার বা কাদের অবদান অনস্বীকার্য বলে আপনি মনে করেন?

পৌষালি দি: আমার জীবনে এমনিই মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তো এই ব্যাপারে আমার বাবা মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমি আগেও বলেছি আমার বাবা, মা ছাড়া আমি এই জায়গায় পৌঁছতে পারতাম না। আর আমার স্বামী (পারিজাত) তার অবদানও কিছু কম নয়। তার আর আমার প্রফেশন এক না হওয়া সত্বেও প্রতিটা মুহূর্তে সে আমার পাশে থেকেছে, আমাকে সাপোর্ট করেছে। এই কথাটা প্রচলিত আছে একজন পুরুষের সাফল্যের পেছনে একজন নারীর অবদান থাকে, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে পুরোটাই উল্টো। এই কথাটা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে প্রথম আমার husband আমাকে বলেছিল যে রবীন্দ্র সঙ্গীত তো গাও, একবার লোকগীতি টা চেষ্টা করে দেখতে পারো। আর আমি জানি তুমি পারবেও। তখন অনেক রাগারাগি করেছিলাম কিন্তু শেষমেশ ওর কথাটাই ঠিক হলো। তো এই সাপোর্টটা হয়তো খুব কম মেয়েই তার স্বামীর কাছ থেকে পায়। আর আমার মিউজিসিয়ানরা যাদের ছাড়া আমার গান অসম্পূর্ণ তাদের অবদানটাও অনস্বীকার্য।

প্রশ্ন: এই লকডাউনে আপনার দৈনন্দিন জীবনের রুটিনটি কি এবং কেমন কাটছে আপনার দিন?

পৌষালি দি: এক কথায় অসাধারণ কাটছে। আসলে বিগত ৪,৫ বছর এত ব্যাস্ততার মধ্যে কেটেছে যে ঠিক ভাবে আমার বাবা, মায়ের সাথে বেশ অনেকটা সময় একসাথে কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এই লকডাউনে বিগত ৩,৪ মাস ধরে বাবা, মায়ের সাথে সারাক্ষণ থাকতে পারছি এই কারণে লকডাউনটা আমার বেশ ভালোই কাটছে।
আমি একদমই সকাল করে উঠতে পারি না, আমার সকাল মানে দুপুর বেলা। আর সেটা নিয়ে আমি বাড়ির সবার কাছে খুবই বকা খাই। এছাড়া এখন অনেকটা সময় পাচ্ছি রেওয়াজ করার সেটা মন দিয়ে করছি। তাছাড়া গান করা, গান রেকর্ডিং, এসব নিয়ে সময় কেটে যাচ্ছে।

প্রশ্ন: যে সকল মানুষ লোকগান শোনেন বা ভালোবাসেন ও আপনার গান শুনতে ভালোবাসেন তাদের উদ্দেশ্যে আপনি কি বলতে চান?

পৌষালি দি: তাদের কে একটা কথাই বলতে চাই যে, আরো বেশি বেশি করে লোকগান শুনুন, লোকগানকে ভালোবাসুন। আর একার পক্ষে লোকগানটাকে বিশ্বের দরবারে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ আপনারাও সাহায্য করুন, এগিয়ে আসুন যাতে লোকসঙ্গীতটা তার সঠিক মর্যাদা পায়। আর সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সুরক্ষিত থাকুন।

সবশেষে এবিও পত্রিকা পক্ষ থেকে পৌষালি দিকে কে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। তার মহামূল্যবান সময় থেকে আমাদের কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য।
আমাদের তরফ থেকে আপনার আগামী দিনের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল। আপনি ও আপনার পরিবারের সকলে ভালো থেকো, সুস্থ থেকো, এবং সুরক্ষিত থেকো এই কামনাই করি।

আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন: https://facebook.com/abopatrika/

এই টেলিফোনিক ইন্টারভিউ টির লিখিত রূপ দিতে সাহায্য করেছে: Susmita Sen

- Advertisment -

জনপ্রিয়

সরস্বতী নাট্যোৎসবের দ্বিতীয় পর্যায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগরে

করোনা প্রকোপ খানিক শান্ত হতে না হতেই এই শীতের মরসুমে নাট্যপিপাসু দর্শকদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া নাট্যোৎসবে...

“পাই” এর উৎসবে মাতলো কলকাতা। ২০ থেকে ২৬ শে জানুয়ারি পর্যন্ত চললো সেলিব্রেশন

কলকাতায় গল্ফগ্রীনে পুরো সপ্তাহ ধরে চললো "পাইয়ের উৎসব"। "দ্য পাই হাউসের" পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পাই ডে উপলক্ষে ২০ থেকে ২৬ শে জানুয়ারি সেলিব্রেট করা...

কলকাতা প্রেক্ষাপট এর নাট্য – পার্বণ

ভারতীয় সংকৃতির পীঠস্থান আমাদের এই বাংলা । নাট্যচর্চা বাংলার তথা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব ধারাকে বহন করে নিয়ে চলেছে প্রাচীনকাল থেকেই । বরাবরই বিভিন্ন...

সুযোগ পেলে আমিও স্বাস্থ্য সাথীর কার্ড করাবো” বললেন দিলীপ ঘোষ

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নে এবার সামিল রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। স্বাস্থ্য সাথীর কার্ড করেছেন দিলীপ ঘোষ ও তার পরিবার এমনই দাবি করলেন বীরভূম...