Home সাক্ষাৎকার "দুপুর ঠাকুরপো" থেকে "কে তুমি নন্দিনী" আজকের সাক্ষাৎকারে মিউজিক ডিরেক্টর অম্লান চক্রবর্তী

“দুপুর ঠাকুরপো” থেকে “কে তুমি নন্দিনী” আজকের সাক্ষাৎকারে মিউজিক ডিরেক্টর অম্লান চক্রবর্তী

অম্লান চক্রবর্তী” এই মানুষটির বেপারে যতই বলবো, সেটা কম বলা হবে। অম্লান দা-র সৃষ্টি করা সুর অন্তত একবার হলেও শোনেন নি এমন মানুষ হয়তো খূঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। এপার বাংলা এবং ওপার বাংলায় সমান ভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তার যার সৃষ্টি করা গান। তিনি শুধু একজন ভালো মিউজিক ডিরেক্টর নন, ব্যক্তিগত জীবনে খুব ভালো একজন মানুষ ও তিনি। আজকের সাক্ষাৎকারে এমনই একজন মানুষের মুখোমুখি আমি রাজেশ

amlaan-chakraborty-music-director
Amlaan Chakraborty Music Director

প্রশ্ন: “অম্লান চক্রবর্তী” এই নামটা আজ সবার কাছে ভীষণ পরিচিত। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ থেকে মিউজিক ডিরেক্টর অমলান চক্রবর্তী হয়ে ওঠার পিছনে স্ট্রাগল কতখানি?

অম্লান দা: স্টাগেল বলতে গেলে সেটা অনেকখানি, হিসেব করে বলা যাবে না। নিজের দায়িত্ব নিজের মাথায় নিয়ে প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে এগিয়ে যাওয়া-টাই স্ট্রাগেল।
কলেজ লাইফেই বাংলা ব্যান্ড শুরু করি। আমাদের ব্যান্ডের নাম ছিলো “গ্রীনক্স”। যে কথাটা না বললে নয় সেটা হলো আমাদের “গ্রীনক্স”-এ আমরা বাংলা হিন্দি ইংলিশ ও নেপালি এই চারটে ভাষায় গান করতাম। যেটা হয়তো খুব কম ব্যান্ডের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। তার পর আমি “লেটার্স ফ্রম শিলিগুড়ি” নামের একটা প্রজেক্ট এর কাজ করি। পাশাপাশি “ইথার” নামের একটা ব্যান্ড এর সাথে কাজ করতে থাকি। আমার কাজ করা এই দুই ব্যান্ডের অ্যালবামই ন্যাশনাল ইন্টারন্যাশনাল লেভেলেও পৌছায়। এর পাশাপাশি পড়াশোনাও মন দিয়ে করতে থাকি। এম বি এ কম্পিলিট করে ব্যাঙ্কের চাকরিতে ঢুকি। কোলকাতা দিল্লী শিলিগুড়ি মিলিয়ে বছর চারেক চাকরি করি। তারপর বাবার অসুস্থতার কারণে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাকরি ছেড়ে বছর দুই বাড়িতেই থাকি। তারপর একটা ব্যবসা শুরু করি, কিন্তু সেটাতেও সফলতা না পাওয়ায় বছর দেড়েক পরেই ব্যবসা বন্ধ করে মনে মিউজিক ডিরেক্টর হওয়ার স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে কোলকাতা চলে আসি। শুরু হয়ে যায় আরেক লড়াই। আমি জটিলতা বুঝতাম না, সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলতাম আর হয়তো সেই কারণেই ঠকতে হতো বেশিরভাগ সময়। অনেক অপমানিত হয়েছি অনেকের কাছে, যারা সেই সময় অপমান করেছিলো তারাই আজ নিজে থেকে আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে এগিয়ে আসে। তাদের মধ্যে কিছু মানুষ আজ আমার ভালো বন্ধু, কেউ কেউ আমায় দেখে লজ্জায় কথা বলতে পারেনা আর বেশকিছুর সাথে আমি নিজেই কথা বলিনা।😇

অনেকেই ছিলো যাদের জন্য আমি কাজ করেছিলাম কিন্তু রিলিজ এর পর দেখেছি সেখানে আমার কোনো নাম নেই। এমনও সময় কাটিয়েছি যখন আমায় মাত্র একশো টাকায় চার পাঁচ দিন চালাতে হয়েছে। সেই সময় আমার অনেক বন্ধুই চাকরি করে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কিন্তু কখনোই নিজের কাছে নিজেকে হারতে দিই নি। প্রতিদিন নতুন কিছু শিখেছি।
আর এই স্ট্রাগেল টুকু না থাকলে হয়তো যতটুকু পেয়েছি, সেই পাওয়ার মজাটাই পেতাম না।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয় শুধু স্ট্রাগল দিয়েই কি মানুষ এগিয়ে যেতে পারে, নাকি ভাগ্যের হাত থাকা টাও জরুরি?

অম্লান দা: খুব সুন্দর একটা প্রশ্ন। প্রথমেই বলি যে হার্ডওয়ার্ক টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি ভাগ্যে খুবই বিশ্বাস করি না, তবে এই কথাটা তো মানতেই হবে যে আমার মত ভালো কাজ আরো অনেকে করে, কিন্তু তারা অনেকেই এখনও এই জায়গায় পৌছাতে পারেনি। অতয়েব বলতে গেলে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথে ভাগ্য, সময় এবং হার্ডওয়ার্ক এই তিনটে জিনিসের ব্যলেন্সটা খুবই দরকার। আর তার সাথে দরকার ভালো কর্ম। কারণ আমি মনে করি যে ভালো কর্ম করলে তবেই ভালো ফল পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: “দুপুরের ঠাকুরপো” থেকে শুরু করে “কে তুমি নন্দিনী” সব থেকে ভালো লেগেছে যাদের সাথে কাজ করে?

অম্লান দা: “দুপুর ঠাকুরপো” থেকে কে “তুমি নন্দিনী” সহ আমার করা বেশীর ভাগ ওয়েব সিরিজ ও ফ্লিম এর মধ্যে 80% কাজ আমার SVF এর জন্য করা। তো বলতে পারো আমার সবচেয়ে প্রিয় প্রোডাকশন হাউজ SVF। তাছাড়া এত দিন যাদের সাথে কাজ করেছি তাদের সকলের সাথে কাজ করেই খুব ভালো লেগেছে আমার।

প্রশ্ন: ছোটো বেলায় সবার স্বপ্ন থাকে বড়ো হয়ে ডাক্তার হবো বা ইঞ্জিনিয়ার হবো ইত্যাদি। আপনি বড়ো হয়ে কি হবো বলে ভাবতেন?

অম্লান দা: সত্যি বলতে ছোটো থেকে কোনোদিনই আমার ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবার ইচ্ছা ছিলো না। তবে ইচ্ছা ছিল ক্রিকেটার হবো। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলতামও কিন্তু বড়ো হবার সাথে সাথে ক্রিকেটের ভুতটা মাথা থেকে চলে যায়। কিন্তু মিউজিক নিয়ে আমি সব সময় স্বপ্ন দেখতাম এবং বড়ো হয়ে মিউজিক নিয়ে ক্যারিয়ার গড়বো এটাও ঠিক করেছিলাম। আমার স্বপ্ন গুলো মিউজিক কে ঘিরেই ছিল চিরকাল।

প্রশ্ন: আজ তিন তিনটে হিট ফিল্ম, বেশ অনেক গুলো ওয়েব সিরিজ এ কাজ করেছেন আপনি। তো আপনার কাছে সব চেয়ে বড় প্রাপ্তি টা কি বলে মনে হয়?

অম্লান দা: আমি 2015 এবং 2016 তে দুটি ফিল্ম এ কাজ করি, কিন্তু শেষে সেই ফিল্ম দুটি আর রিলিজ হয় নি। তো সেই দুটোকে ধরলে এখনো পর্যন্ত পাঁচটি ফিল্ম।
হাজার হাজার মানুষ যখন আমার গান গায়, আমার গানের প্রশংসা করে সেটাই আমার কাছে সবচয়ে বড়ো পাওয়া। শুধু টাকার জন্যে কাজ করবো এরকম মানসিকতা আমার বা কোনো শিল্পীরই থাকে না। একজন শিল্পীর কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো মানুষের প্রশংসা ও তাদের ভালোবাসা। যেটা আমি আমার শ্রোতাদের কাছ থেকে পেয়েছি। এখন যখন দেখি মানুষ আমার গান ভালোবেসে গাইছে, কভার করছে তখন খুবই ভালো লাগে। ভারতের মত বাংলাদেশের মানুষের কাছেও আমার গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে, এটাই আমার কাছে আমার অনেক বড় পাওয়া।

প্রশ্ন: এই লকডাউনে পরিবারের সকলের সাথে সময় কাটাতে পেরে কেমন লাগছে?

অম্লান দা: আসলে এই লকডাউনে আমি আমার পরিবারের সাথে নেই। তবে রোজই দুই তিনবার ভিডিও কল-এ বাবা, মায়ের সাথে কথা হয়। আমার বাড়ি শিলিগুড়ি, সেখানেই আমার বড়ো হওয়া, আমার পড়াশোনা। কিন্তু এখন আমি কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে আছি।
তবে লকডাউন হবে আগে জানলে আমি শিলিগুড়িতে থেকে যেতে পারতাম।

প্রশ্ন: লকডাউনে আপনার দৈনন্দিন জীবনের রুটিনটি কি, মানে এই দিনগুলো আপনি কি ভাবে কাটাচ্ছেন?

অম্লান দা: আমি সবসময় গান নিয়েই থাকি। আগেই বললাম আমি কলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে আছি। এখানে আমার নিজের কাজের সেট আপ-ও আছে। সেখানেই নেট ফ্লিক্স, আমাজন, গান করা,গান শোনা, গান নিয়ে পড়াশোনা, নতুন গানও তৈরী এসব নিয়েই আমার দিন কাটছে। এছাড়াও অনেক গান বানাচ্ছি আগামী দিনের জন্য। তাছাড়া লকডাউনের কারণে সব কাজ বন্ধ। লকডাউন মিটলেই আমার কাজ করা বেশ কিছু ফিল্ম, ওয়েবসিরিজ-ও রিলিজ হবে।

প্রশ্ন: এই গৃহবন্দী সময় আপনি আপনার নিত্যদিনের রুটিনে কি পরিবর্তন এনেছেন?

অম্লান দা: এই লকডাউনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আমার ঘুমের ওপর😴। আগে আমি 12 টা 12:30 মধ্যে ঘুমাতাম ও সকালে 7 টায় ঘুম থেকে উঠতাম কিন্তু এখন ঘুমোতে ঘুমোতে ভোর হয়ে যাচ্ছে যার জন্য ঘুম থেকে উঠতে দুপুর 12 টা বেজে যাচ্ছে, এটা একটা আমূল পরিবর্তন হয়েছে। অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম মেডিটেশন টা শুরু করবো ফাইনালি এই লকডাউনের কিছুদিন আগে থেকে শুরু করেছি, এবং এই মেডিটেশন করার মধ্যে দিয়েই অনেক ভালোলাগার জিনিস তৈরী হয়েছে। একটা আলাদাই এনার্জি পাচ্ছি, সেটা কাজ কর্ম, চিন্তা ভাবনা সব কিছুর জন্যই। আর সাথে অল্প এক্সারসাইজ করা শুরু করেছি। আর নতুন ধরনের বিভিন্ন খাবার বানাচ্ছি, পাশাপাশি ওয়েব সিরিজ দেখতাম এখন আরো বেশি করে দেখছি।

প্রশ্ন: মানুষের সুদিনে বা দুর্দিনে, দুঃখে বা সুখে সবসময়ের সঙ্গী হলো আপনার মতো সুরকার দের সৃষ্টি করা সুর। মানুষ হয়ত অতদিন বেঁচে থাকেনা যতদিন সুর বেঁচে থাকে। এই প্রাপ্তিটা আপনার কাছে কতটা মূল্যবান?

অম্লান দা:  এই প্রাপ্তিটা সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি। একটা শিল্পী যতদিন বাঁচুক আর নাই বাঁচুক তার সৃষ্টি কাজ গুলো সারা জীবন আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে। যেমন ইরফান খান, ঋষি কপূরের মতো মানুষ গুলো হয়তো আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু তাদের করে যাওয়া কাজগুলো আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে। আমার এটাই বড়ো পাওয়া যে আমার কাজ ও হয়তো মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকবে যখন আমি হয়তো থাকবো না।

প্রশ্ন: সব শেষে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চান?

অম্লান দা: আমি আমার শ্রোতাদের এটুকুই বলবো যারা আমার গান শোনেন বা শুনছেন তারা এই ভাবেই আমার গান ভালোবেসে যাবেন। আপনাদের ভালোবাসা, উৎসাহ পেলে আগামী দিনে আরো ভালো ভালো গান আপনাদের উপহার দেবো। আপনাদের ভালোবাসা আমাদের পুরো টিম এর কাছেই খুবই মূল্যবান।
আর এই লকডাউনে খুব খারাপ পরিস্তিতির মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি আশা করি এই খারাপ সময়টা খুব তাড়াতাড়ি কাটিয়ে উঠবো। যাদের সাহায্যের দরকার তাদের জন্য অবশ্যই নিজের সামর্থ মতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। আর সকলে খুব ভালো থাকুন। এই খারাপ সময় সকলে মিলে আমরা কাটিয়ে উঠবোই।

সবশেষে আমাদের এবিও পত্রিকা-র পক্ষ থেকে অম্লান দা কে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। তার মহামূল্যবান সময় থেকে আমাদের কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য।
আমাদের তরফ থেকে আপনার আগামী দিনের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইলো। আপনি ও আপনার পরিবার ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, এবং সুরক্ষিত থাকুন এই কামনাই করি।

টেলিফোনিক ইন্টারভিউ কে লিখিত রূপ দিতে সাহায্য করেছে Ms. Susmita Sen

Amlaan Chakraborty wikipedia: https://en.wikipedia.org/wiki/Amlaan_Chakraborty

Amlaan Chakraborty FB Page: https://www.facebook.com/iamamlaan/

ABO Patrika FB Page: https://www.facebook.com/abopatrika/

- Advertisment -

জনপ্রিয়

মায়ের মৃত্যুদিনে পথ পশুদের কল্যাণার্থে পারমিতা মুন্সী ভট্টাচার্য এর পরিচালনায় হয়ে গেলো ‘বর্ষ বরণে বিবিয়ানা’

পথপশুদের কল্যাণার্থে শিবানী মুন্সী প্রোডাকশনের 'বর্ষবরণে বিবিয়ানা' শীর্ষক বাংলা নববর্ষের ক্যালেন্ডার প্রকাশ হয়ে গেল। এই ক্যালেন্ডার থেকে সংগৃহীত অর্থ খরচ করা হবে পথ পশুদের...

কি করলে আপনাকে বা আপনার পরিবারকে ছুঁতে পারবেনা করোনা

বর্তমানের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পাওয়াটাই এখন সকল মানুষের একমাত্র লক্ষ্য. কিন্তু কিভাবে পাবো এই ভয়ানক কোবিড ১৯ এর হাত থেকে মুক্তি? কোবিড ১৯ ভাইরাস...

অতিমারির মধ্যেও প্রকৃতির আরো কাছে ফিরে যাচ্ছেন জয়া আহসান..

করোনা নামক ভয়ঙ্কর ভাইরাস বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সকলকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। কিন্তু শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে তার কণ্ঠে বিষন্নতা রয়েছে। চারিদিকে...

চারিদিকে অক্সিজেনের হাহাকার, এই পরিস্থিতিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন টলি তারকারা…

গোটা বিশ্ব আজ করোনা মহামারীর কবলে। Covid এর দ্বিতীয় ঢেউ তে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ সাথে মৃত্যু। করোনার দ্বিতীয় ঢেউতে এই প্রথম দৈনিক সংক্রমণ বেড়ে...