Home সাক্ষাৎকার "বাংলা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে" সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জয়তী ভাটিয়া

“বাংলা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে” সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জয়তী ভাটিয়া

প্রায় ২৫ বছরেরও বেশি অভিনয় জগতে যার দাপট, বলিউড এবং টলিউডের বহুল পরিচিত একটা মুখ। যাকে শুধু অভিনয় নয়, তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় সমাজ সেবামুলক কাজেও। আজকের আমাদের আড্ডায় সেই প্রখ্যাত অভিনেত্রি জয়তী ভাটিয়ার মুখোমুখী আমি সুস্মিতা

প্রশ্ন: হিন্দি টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ জয়তী ভাটিয়া। 1995 এ আপনাকে প্রথম খুসনুমা’র চরিত্রে আমরা টিভি সিরিয়ালে দেখতে পেয়েছি। তো সাধারণ জীবন থেকে আপনার অভিনয় জগতে আসা কিভাবে?

জয়তী ভাটিয়া: যেহেতু আমি বাঙালী পরিবারের মেয়ে সেহেতু আমি সম্পূর্ণ ভাবে বাঙালী সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। বাঙালী পরিবারের মধ্যে একটা ব্যাপার লক্ষ করবে, বেশীর ভাগ বাঙালী বাবা, মা চায় তার মেয়ে গান শিখুক, সবার সামনে বলতে পারে আমার মেয়ে খুব ভালো গান গায়, সবাই বলবে একটা গান শোনাযও, যা হয়ে থাকে আর কি, সেরকমই আমার বাবা, মা’ও সেই ভাবনা নিয়েই আমাকে গানে ভর্তি করে। কিন্তু গান শিখতে শুরু করার কিছু দিন পর তারা বুঝতে পারেন যে গান আমার দ্বারা হবে না। তখন মা ঠিক করেন যে গানটা তো হলো না, তবে নাচেই দেওয়া যাক। তখন আমি (ক্লাসিকাল) নাচ শিখতে ভর্তি হই। এরপর 17 বছর আমি নাচ করেছি। Ministry of culture থেকে পরপর তিন বছর আমি স্কলারশিপও পেয়েছি। আমি English Literature নিয়ে পড়াশোনা করেছি, পাশাপাশি আমি রাশিয়ান লঙ্গুয়েজ নিয়েও পড়াশোনা করেছি। তো রাশিয়ান লাঙ্গুয়েজ ক্লাস যখন করতে যেতাম, সেখানে ক্যান্টিনে হঠাৎ একদিন ড্রামা স্টুডিও ডিরেক্টর আমাকে দেখেন এবং আমাকে ডেকে পাঠান। তো সেখানে আমি আমার বন্ধুদের সাথে যাই। সেই সময় তিনি একটি স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন মুসলিম কালচার নিয়ে। স্ক্রিপ্ট টা এরম ছিলো যে সেখানে বড়ো মেয়েকে পড়তে না দিয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় কিন্তু ছোটো মেয়ে একটু Rebellious টাইপের। জানি না তখন তিনি আমার মধ্যে কি Rebellious দেখেছিলেন। তো উনি আমাকে প্রথম কাস্ট করেন সেই স্ক্রিপ্ট এর ছোটো মেয়ের ভূমিকায়। এই ভাবেই আমার অভিনয় জগতে আসা।

প্রশ্ন: আপনার ওড়িশা তে জণ্ম এবং দিল্লী’তে বড় হয়ে ওঠা। তাও এত সুন্দর বাংলা আপনি বলেন কিভাবে?

জয়তী ভাটিয়া: আগেই বললাম আমি বাঙালী পরিবারের মেয়ে তাই বাংলা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। কিন্তু একটা মজার ব্যাপার আমি বাংলা মোটামুটি পড়তে ও বলতে পারতাম, কিন্তু লিখতে পারতাম না। আমার যখন ২৪ বছর বয়স তখন আমি কাজের জন্য কলকাতায় যাই সেখানে আমাদের এক পরিচিত- এর বাড়িতে থাকতাম। যার বাড়িতে থাকতাম তিনি ছিলেন স্কুলের টিচার। তার মেয়ে তখন ক্লাস 4 এ পড়তো, তো সে আমায় ধরে ধরে ক- ৺, অ-ঔ বাংলা বর্ণ আমাকে শিখিয়েছে।

প্রশ্ন: তানসেনের তানপুরা আপনার বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম কাজ, সেই অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

জয়তী ভাটিয়া: ভীষণ ভালো, ভীষণ একসাইটেড। আসলে 1995-1996 সাল নাগাদ 2 মাসের জন্য আমি কলকাতায় এসেছিলাম এবং কোলকাতার ডিরেক্টরদের সাথে দেখা করেছিলাম টেলিভিশনের জন্য বা ফিল্মের জন্য। কিন্তু তখন হয়তো সঠিক সময় ছিল না তাই বাংলায় অভিনয়ের সুযোগ পাইনি। কিন্তু ঘটনাচক্রে আমি আমার বাঙলাতেই ফিরে এলাম তানসেনের তানপুরা’র হাত ধরে। তানসেনের তানপুরায় অভিনয়ের সুযোগ আসার আগেও আমি ডিরেক্টর সৌমিক চট্টোপাধ্যায়, DOP প্রসেনজিৎ, স্ক্রিপ্ট রাইটার সৌগত বসু, মিউজিক ডিরেক্টর জয় সরকার, এনাদের কথা আমি শুনেছিলাম, এনাদের কাজও আমি দেখেছিলাম, তখনও এনাদের আপন মনে হতো। তাই যখন SVF থেকে আমার কাছে অফার যায় আমি সঙ্গে সঙ্গেই হ্যাঁ করে দি, তখন জানতামও না যে তানসেনের তানপুরার জন্য আমাকে কাস্ট করা হচ্ছে। আর অবশ্যই আমার সহ অভিনেতা বিক্রম চ্যাটার্জী (আলাপ), রূপসা চ্যাটার্জী (শ্রুতি) এরা না থাকলে শ্যুটিং করতে এত মজা হতো না। বিক্রম আমাকে প্রথম দিনই ভীষণ ভাবে আপন করে নিয়েছিল, সাথে রুপসাও। ওকে আমি শোনাতাম যে এই ভাবে লিরিক্স গুলো প্রাকটিস করেছি। আসলে আমি গানের লিরিক্স একদমই মনে রাখতে পারতাম না। ওরা ভীষণ হাসাহাসি করতো আর বলতো “এরকম কাউকে দেখিনি যে নেচে নেচে লিরিক্স মনে রাখে”। আর সবাই এত ভালোবাসা দিয়েছে, আমাকে গ্রহণ করেছে, সাপোর্ট দিয়েছে তার জন্যই মধুমন্তি মিশ্র আজ সকলের মনে জায়গা করতে পেরেছে। তো এটা আমার কাছে সবচয়ে বড়ো পাওয়া বলতে পারো।

প্রশ্ন: অভিনয়ের পাশাপাশি আপনি একজন খুব ভালো নৃত্যশিল্পী, সাথে পরিবার। একাহাতে সবকিছু সামলান কিভাবে?

জয়তী ভাটিয়া: সত্যি কথা বলতে আমি সব কিছু একা হাতে সামলাতে পারি না। অনেক সময় ছোটো ছোট জিনিস গুলো মিস করে যাই। তবে আমার পরিবারকে আমি কতটা সময় দিতে পারি জানি না, কিন্তু আমার পরিবার, আমার হাসব্যান্ড, আমার মা আমাকে ভীষণ সাপোর্ট করে সবসময়। এই লকডাউনে ৪ মাস মায়ের সাথে থাকতে পেরেছি, মায়ের সেবাযত্ন করার সুযোগ পেয়েছি। আমি মনে করি চেষ্টা করলে সবকিছু হয়, শুধু সময়টা বার করে নিতে হয়। আর আমি নিজেকে সময় দিতে ভালোবাসি তাই পরিবারকে সময় দেবার পাশাপাশি নিজের জন্য কিছুটা সময় বাঁচিয়ে রাখি।

প্রশ্ন: তানসেনের তানপুরা‘য় আমরা আপনাকে একজন বিখ্যাত শাস্ত্রিয় সঙ্গীতজ্ঞের ভূমিকায় দেখেছি, পার্সোনাল জীবনে আপনার সাথে গানের কতটা যোগ আছে?

জয়তী ভাটিয়া: হ্যাঁ বাবা, মা চেয়েছিলেন আমি গান শিখি কিন্তু আমার গানের প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট ছিলনা। আর আমি গান গাইতেও পারি না। কিন্তু আমি যেহেতু 17 বছর নাচ করেছি তাই আমার কান খুব পাকা, কেউ বেতালা, বেসুরো গাইলে তাকে আমি ধরিয়ে দিই কিন্তু নিজের গানের বেলা যে কখন বেতলা বেসুরো হয়ে যাই সেটা নিজেও বুঝতেও পারি না। তবে তানসেনের তানপুরায় আমার যে ক্যারেক্টার মধুমন্তী সেটা ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। আমি এরকম ফিল্ম আগে কখনো করি নি যেখানে আমাকে গানের লিপসিং করতে হয়েছে। তানসেনের তানপুরায় আমি কখনো ডায়লগ বলতে গিয়ে ফাম্বল করিনি তবে আমার একটা কথা খুব মনে পরছে, শুধু একটা জায়গা যেখানে আমায় বলতে হয়েছে “আমি বিদুষী মধুমন্তী মিশ্র বলছি“। তো এই বিদুষী বলতে গিয়ে আমার অনেকবার আটকেছে। কারণ মনে মনে তো আমি জানি আমার গানের অবস্থা কি😂। কিন্তু যখন আমাকে গানের লিপসিং করতে বলা হয়েছে তখন সেটা আমার কাছে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং ছিল, যে এমন ভাবে করতে হবে যাতে মনে হয় আমি নিজে গানটা করছি।

প্রশ্ন: সফলতার রাস্তা কখনোই সহজ হয় না, আপনি কি এই কথাটায় বিশ্বাস করেন? যদি করেন তাহলে আপনার কাছে এই রাস্তাটা কতটা কঠিন ছিল?

জয়তী ভাটিয়া: সফলতার রাস্তা কখনোই সহজ হয়না। কারো ক্ষেত্রে বেশি কঠিন কারো ক্ষেত্রে একটু কম। কিন্তু যেটা করতে হবে সেটা ১০০% হার্ড ওয়ার্ক। সবসময় এই কথাটা মাথায় রাখতে হবে যে অনেক মানুষ একই জায়গায় একসাথে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। নিজেকে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত তৈরি করে যেতে হবে।

কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এরকম কোনো গল্প নেই যে আমি মুম্বাইতে এসে রাস্তায় ছিলাম, বেঞ্চে শুয়েছি, বরাপাও খেয়েছি এরকম কোনো ব্যাপার নেই। তবে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই শ্রী অনুপম খের ও একতা কাপুর, বিবেক অগ্নিহোত্রি, ইব্রাহিম আলকাজী আমার গুরু এনাদের জন্যই আমি আজ এই জায়গায় পৌঁছতে পেরেছি। এই কথাটা আমি সবসময় মেনে চলি যে চেষ্টা করে যাও সফলতা ঠিক ধরা দেবে।

প্রশ্ন: আপনি অবসর সময় কি করতে ভালোবাসেন?

জয়তী ভাটিয়া: অবসর সময়ে আমি ভীষণ বই পড়তে ভালবাসি। যেমন – ফিকশন, রোমান্স, অটো বায়োগ্রাফি, থ্রিলার ইত্যাদি। আর সাথে নিজেকে সময় দিতে ভালোবাসি। এখন দেখি বাচ্চাদের মধ্যে সেই বই পড়ার প্রবণতা কমে যাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্যে আমার একটাই অনুরোধ বই পড়ো, বই পড়ার মধ্যে একটা আলাদাই ভালোবাসা খুঁজে পাবে।

প্রশ্ন: আমরা শুনেছি আপনি LGBT সাপোর্ট করেন। সেই বেপারে আপনি কি বলবেন?

জয়তী ভাটিয়া: আজ থেকে ৩ বছর আগে শ্রীধর রাঙ্গাইন ও সাগর গুপ্তা “কাসিশ” ফেস্টিভ্যালটি করেন সেখানে আমি জুরি হিসেবে নিমন্ত্রিত ছিলাম। এনাদের সাথে আমি অনেক বছর আগে একটা ফিল্ম করেছিলাম যেখানে চারটে স্টোরির মধ্যে একটি ছিল LGBT সংক্রান্ত। তখন থেকেই এনাদের সংস্পর্শে ছিলাম। এমনকি LGBT নিয়ে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালও হয় আমাদের ইন্ডিয়াতে। কাসিশ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে (KASHISH Film Festival) ফিল্ম গুলো দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। আমার তখন মনে হয় যে যেমনই বা যাই হোক না কেনো আমরা সবাই মানুষ। ওদের কেনো আলাদা করে রাখা হয়। আমিও যেমন চাই যে কাজটা আমি করছি সেটা মানুষ গ্রহণ করুক, ভালোবাসুক, তেমনই ওরাও তাই চায়। আর “সকলকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলা” এটাই আমাদের জীবনের মূল মন্ত্র হওয়া উচিত। তাই ওদেরকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।

প্রশ্ন: সবশেষে আপনি আপনার শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কি বলতে চান?

জয়তী ভাটিয়া: এটাই বলবো তানসেনের তানপুরার দেখে আপনারা যেভাবে আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন তার জন্য আমি আপনাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ, এই ভাবেই ভালোবেসে যাবেন, আপনাদের ভালোবাসা আমাদের কাছে সবকিছু। এখন পরিস্তিতি খুবই খারাপ তাই নিজেরা সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। জানবেন আপনি সতর্ক হলে আপনাকে দেখো বাকিরাও সতর্ক হবে।

সবশেষে এবিও পত্রিকা পক্ষ থেকে জয়তী ভাটিয়া কে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ। তার মহামূল্যবান সময় থেকে আমাদের কিছুটা সময় দেওয়ার জন্য।
আমাদের তরফ থেকে আপনার আগামী দিনের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইল। আপনি ও আপনার পরিবারের সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, এবং সুরক্ষিত থাকুন এই কামনাই করিI

Concept: Rajesh Paul

আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন: https://facebook.com/abopatrika/

- Advertisment -

জনপ্রিয়

সরস্বতী নাট্যোৎসবের দ্বিতীয় পর্যায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে উত্তর চব্বিশ পরগনার অশোকনগরে

করোনা প্রকোপ খানিক শান্ত হতে না হতেই এই শীতের মরসুমে নাট্যপিপাসু দর্শকদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া নাট্যোৎসবে...

“পাই” এর উৎসবে মাতলো কলকাতা। ২০ থেকে ২৬ শে জানুয়ারি পর্যন্ত চললো সেলিব্রেশন

কলকাতায় গল্ফগ্রীনে পুরো সপ্তাহ ধরে চললো "পাইয়ের উৎসব"। "দ্য পাই হাউসের" পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পাই ডে উপলক্ষে ২০ থেকে ২৬ শে জানুয়ারি সেলিব্রেট করা...

কলকাতা প্রেক্ষাপট এর নাট্য – পার্বণ

ভারতীয় সংকৃতির পীঠস্থান আমাদের এই বাংলা । নাট্যচর্চা বাংলার তথা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব ধারাকে বহন করে নিয়ে চলেছে প্রাচীনকাল থেকেই । বরাবরই বিভিন্ন...

সুযোগ পেলে আমিও স্বাস্থ্য সাথীর কার্ড করাবো” বললেন দিলীপ ঘোষ

মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নে এবার সামিল রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। স্বাস্থ্য সাথীর কার্ড করেছেন দিলীপ ঘোষ ও তার পরিবার এমনই দাবি করলেন বীরভূম...